একটি প্রজন্ম নিজেকে খুঁজেছিল ধ্বংসের মধ্যেও সৃষ্টির সন্ধানে। তাদের ভয় ছিল না হারানোর, বরং ভয় ছিল নিশ্চুপ হয়ে যাওয়ার। কিন্তু সময়ের স্রোতে সেই কণ্ঠস্বর আজ প্রশ্নের আড়ালে চাপা পড়েছে—অস্বস্তিকর, অদম্য কিছু প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর খোঁজার সাহস আমরা হারিয়ে ফেলেছি।
সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলো আসে ভূমি থেকে, মাটি থেকে। যারা নিজেদের পূর্বপুরুষদের জমি রক্ষার জন্য লড়াই করে, রাষ্ট্রের যন্ত্র তাদেরই কীভাবে ‘দেশদ্রোহী’ তকমা দেয়? অন্যদিকে, সেই একই জমি দখল করে, কর্পোরেট শক্তি যখন আদিবাসী জনগণকে উচ্ছেদ করে, সেটাকেই কীভাবে ‘সভ্যতার অগ্রযাত্রা’র ইতিহাস হিসেবে লেখা হয়? এই দ্বৈততা আমাদের নৈতিকতাকে কোন খাতে বইয়ে দিচ্ছে, সে প্রশ্নটি আমরা গলা ফাটিয়ে তুলতে পারি না। আমরা কেবল মখমলের স্বপ্নে বিভোর এক মধ্যবিত্ত সমাজ, যারা বারবার শুধুই আরামদায়ক গল্পের খোঁজ করে—‘আহা, আমাদেরও সেই দিন আসবে’। আজকের সেই বাস্তবতা, যেখানে অর্থনৈতিক উদারীকরণের প্রতিশ্রুতির আড়ালে বেড়ে চলা বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক অসমতা মানুষকে এক গভীর অনিশ্চয়তায় ঠেলে দেয়। যেখানে রাজনীতি ক্রমাগত সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতিতে রূপ নিয়ে ব্যক্তির অন্তর্দন্দ্বকে করে তোলে আরও জটিল। আজকের মানুষের মনের গহীনে যে বিকার বা সংকট, তা কেবল ব্যক্তির মানসিকতার ফ্রয়েডীয় জটিলতা নয়; বরং এটি 'নতুন ভারত'-এর রাজনৈতিক আবহ ও অর্থনৈতিক চাপের সমান্তরাল প্রবাহে সৃষ্ট এক সামগ্রিক মানসিক প্রতিক্রিয়া।
কিন্তু রাজনীতি এবং নীতিনির্ধারণের মহাযজ্ঞ আজ ‘দেওয়া-নেওয়া’র এক নগ্ন লেনদেনে পরিণত হয়েছে। সরকারি সাহায্য বা ‘অনুদান’ ভোটের রাজনীতির সরাসরি মুদ্রা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাওয়া-না-পাওয়ার এই সমীকরণ জনগণের মৌলিক অধিকারকে কর্তৃত্বের হাতিয়ারে পরিণত করেছে। এই সুযোগসন্ধানী মনোভাব রাজনীতির গৌরবময় ইতিহাসকে ধ্বংসের অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে ।
আমি হেরে গেছি। এটা কোনও নতুন কথা নয়, না কোনও আকস্মিক দুর্ঘটনা। এটা এক নিয়মিত, নিষ্ঠুর রীতি। বারবার হারি, প্রতিদিন হারার মধ্য দিয়েই যেন আমার অস্তিত্বের হিসাব-নিকাশ চলে। এই পরাজয়গুলোই আমাকে আমার নিজেরই সামনে উন্মুক্ত করে দেয়—আমার সীমাবদ্ধতা, আমার ভয়, আমার অহংকার, এবং কখনো কখনো আমার অবিশ্বাস । পরাজয়ই হল সেই কঠিন শিক্ষক, যে আমাকে 'আমি' কে চিনতে শেখায়; আমাকে আমার ভাঙা হাড়ের গড়ন বুঝতে শেখায় ।

0 মন্তব্য
আপনার মন্তব্য জানান